কীভাবে বানাবে সায়েন্টিফিক পোস্টার ?

ইতালির বিজ্ঞানী মার্কনির আগেই মিলিমিটার রেঞ্জের তরঙ্গ ব্যাবহার করে রেডিও যোগাযোগের ব্যাপারটা আবিস্কার করেছিলেন আমাদের বিজ্ঞানী স্যার জগদীশ চন্দ্র বসু। কিন্তু সঠিক সময়ে প্রকাশ না করার কারণে আজ আমরা রেডিও আবিষ্কারক হিসেবে মার্কনিকে চিনি! ক্যালকুলাসের আবিষ্কার নিয়ে নিউটন-লিবনিজ বিতর্কের কথাও হয়তো শুনে থাকতে পারো! এরকম আরও অনেক উদাহরণ পাওয়া যাবে যারা আগে আবিষ্কার করেও অন্তরালে থেকে গেছেন শুধুমাত্র সঠিক সময়ে,সঠিকভাবে প্রকাশ না করার কারণে! সুতরাং একটি আবিষ্কারের সফলতা শুধু কঠোর সাধনার(গবেষণা) উপরই নির্ভর করে না, ঠিকঠাকভাবে প্রকাশের উপরও নির্ভর করে। তবে প্রকাশ করলেই হবেনা, একটি নির্দিষ্ট কাঠামো মেনে সহজবোধ্যভাবে প্রকাশ করতে হবে।

বিজ্ঞানভিত্তিক যেকোনো গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করার জন্য কয়েকটি জনপ্রিয় মাধ্যম রয়েছে যেমন, সায়েন্টিফিক পেপার,পোস্টার ইত্যাদি। আজকে আমরা দেখবো পোস্টারের মাধ্যমে কীভাবেএকটি গবেষণার বিস্তারিত খুব সুন্দরভাবে উপস্থাপন করা যায় ।

কী কী থাকবে একটি পোস্টারে ?

একটি বিজ্ঞান নিবন্ধ এবং একটি সাহিত্যিক নিবন্ধের মধ্যে মূল পার্থক্য কোথায়? চিন্তা করে হয়তো উত্তর পেয়ে গেছো, না পেলে মিলিয়ে নাও। এদের মধ্যে পার্থক্য একটাই, তা হল বাস্তবতা। বিজ্ঞানের লেখায় অবাস্তব, প্রমাণহীন কিছু থাকবে না। কিন্তু সাহিত্য লেখকের কল্পনা ছাড়া কিছুনা। এজন্যই বিজ্ঞান নিয়ে লেখার ক্ষেত্রে তোমাকে কিছু নিয়ম মেনে লিখতে হবে। একটি সায়েন্টিফিক পোস্টার লেখার সময় নিচের পয়েন্টগুলো থাকতে হবে।

1 Title (শিরোনাম)
2 Introduction or Objectives (ভূমিকা/উদ্দেশ্য)
3 Theory or Hypothesis (তত্ত্ব/অনুকল্প)
4 Materials and Methods (উপকরণ এবংকার্যপদ্ধতি)
5 Result (ফলাফল)
6 Conclusion (উপসংহার)
7 References (তথ্যসূত্র)
8 Acknowledgement (কৃতজ্ঞতা)

তুমি চাইলে আরও ২-১ টি পয়েন্ট যোগ করতে পারো এবং বাদও দিতে পারো। তবে অবশ্যই এমন কিছু যেন বাদ না পড়ে যার জন্য তোমার পোস্টার কিঞ্চিৎ হলেও বুঝতে অসুবিধা হয়। তোমার পোস্টার বুঝতে ভিউয়ারকে যেন অন্য কিছুর সাহায্য নেওয়া না লাগে। বলা হয়ে থাকে একটি আদর্শ পোস্টার এমন হবে যেন তা ৬ ফুট দূর থেকে পড়া যায় এবং ১০ মিনিটেই সম্পূর্ণটা শেষ করা যায়। যাই হোক, চলো উপরের পয়েন্ট গুলো সংক্ষেপে আলোচনা করা যাক।

1 Title(শিরোনাম)

তোমার পোস্টারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হল শিরোনাম। একজন ভিউয়ার তোমার পোস্টার পড়বেন নাকি এড়িয়ে যাবেন সেটা কিন্তু নির্ভর করে তোমার দেওয়া শিরোনামের উপর। শিরোনাম দেখেই যেন ভিউয়ারের মনে পরবর্তী অংশ পড়ার জন্য কৌতূহল সৃষ্টি হয়।খুব সহজ এবংসাবলীল ভাবে শিরোনাম উপস্থাপন করবে। এতে ভিউয়ার আকৃষ্ট হতে বাধ্য। শিরোনাম উদ্ভট টাইপের কিছু হবেনা। মনে রাখবে কোন উপমা না দেওয়াই ভাল। শিরোনাম যেন তোমার পুরো কাজ সম্পর্কে ভিউয়ারকে একটি পরিষ্কার ধারণা দিতে পারে। এতটুক পড়ে হয়তো শিরোনামের একটা দফারফা করবে বলে ভেবে ফেলেছ। কিন্তু আরেকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো শিরোনাম খুব বড় হওয়া যাবেনা। চেষ্টা করবে ২ লাইনের মধ্যে শেষ করতে।

2 Introduction or Objectives (ভূমিকা/উদ্দেশ্য)

ভূমিকা দেওয়ার সময় চেষ্টা করবে ১-২ টাপ্যারাগ্রাফ দিয়ে শেষ করতে। খুব বেশি দরকার না হলে কোন কিছুর সংজ্ঞা দেওয়া যাবেনা। এই সেকশনে তোমার কাজ হল শুধুমাত্র ভিউয়ারকে গবেষণার বিষয়বস্তুর সাথে পরিচিত করানো। এমন কোন তথ্য থাকবে না যাতে ভিউয়ার বিরক্ত হন। প্রকল্পের বিষয়বস্তুকে খুব আকর্ষণীয় ভাবে ফুটিয়ে তুলতে হবে যেন একজন দর্শক/বিচারক বাকিটুকু পড়তে আগ্রহবোধ করে।

3 Theory or Hypothesis (তত্ত্ব/অনুকল্প)

তুমি যদি কোন বৈজ্ঞানিক থিওরি (প্রতিষ্ঠিত বৈজ্ঞানিক সূত্র) নিয়ে কাজ করতে চাও তাহলে এই প্যারায় সেই সূত্রটি উল্লেখ করতে হবে। আর তুমি যদি কোন হাইপোথিসিস নিয়ে কাজ করতে চাও তাহলে এই প্যারায় সেটি উল্লেখ করতে হবে। এক্ষেত্রে বিশদ কোন বিবরণের প্রয়োজন নেই। অনেক ক্ষেত্রে বিষয়বস্তুর জন্য নির্ধারিত প্যারাতেই তুমি থিওরি/হাইপোথেসিসটি উল্লেখ করতে পারো।

4 Materials and Methods(উপকরণ এবং কার্যপদ্ধতি)

গবেষণার কাজে তুমি যেসব উপকরণ/যন্ত্রপাতি ব্যবহার করেছো সেগুলির নাম লিপিবদ্ধ করতে হবে এই সেকশনে। শুধুমাত্র নাম উল্লেখ করলেই চলবে।

তারপর একটু নিচে থেকে তোমার বৈজ্ঞানিক কার্যপদ্ধতি লেখা শুরু করবে। তুমি যেসব পরীক্ষানিরীক্ষা করেছো,যেভাবে বিভিন্ন টুলস ব্যাবহার করেছ, সেসব পদ্ধতিগুলো ধারাবাহিকভাবে লিখবে। মনে রাখবে তুমি যেভাবে পুরো প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছো তার পরিপূর্ণ প্রতিফলন থাকবে এই সেকশনেই। আরও একটি বিষয় অবশ্যই মনে রাখবে তা হল, তুমি তোমার প্রয়োজনে যেকোনো ছবি, চার্ট, গ্রাফ পেপার ইত্যাদি ব্যাবহার করতে পারবে। তবে এগুলো সঙ্গতিপূর্ণ হল কিনা খেয়াল রাখতে হবে। ডাটা উপস্থাপনের ক্ষেত্রে চার্ট অথবা গ্রাফ ব্যাবহার করাই বুদ্ধিমানের কাজ। তুমি চাইলে পুরো বৈজ্ঞানিক কার্যপদ্ধতিটি একটি ডায়াগ্রাম আকারেও উপস্থাপন করতে পারো। এই বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিগুলো তুমি কেন ব্যাবহার করেছ সেটা ব্যাখ্যা করতে ভুলবেনা।

5 Result (ফলাফল)

তোমার প্রকল্পের সার্বিক ফলাফল থাকবে এই সেকশনে। বিস্তারিত ফলাফলের একটি সামারি তথা সারসংক্ষেপ দিয়ে শুরু করা এই সেকশনের জন্য সবচেয়ে ভাল একটি পরিকল্পনা।

তুমি যেই প্রশ্নগুলোর সম্মুখীন হয়ে গবেষণাটি করেছ সেগুলো এখানে নতুন করে বলার দরকার নেই। এখানে তুমি কী ধরণের ডেটা পেয়েছ এবং সেগুলোর সত্যতার বিভিন্ন দিক নিয়ে সংক্ষেপে আলোচনা করবে। এবার একটি প্যারাগ্রাফ কর।

প্যারাটিতে থাকবে তোমার প্রশ্ন এবং প্রাপ্ত তথ্যগুলোর মধ্যে সম্পর্ক। তোমার ডেটাগুলো আসলে কী বোঝাচ্ছে, সেটা পরিষ্কারভাবে লিখবে। দরকার হলে গ্রাফিক প্রেজেন্টেশন ব্যবহার করতে পারো, কারণ বিচারক/দর্শক আক্ষরিক প্যারাগ্রাফের চেয়ে এতে খুব সহজে বুঝতে পারবেন। এক্ষেত্রে চার্ট অথবা গ্রাফ ব্যবহার করা উত্তম কারণ এগুলো সমান জায়গার মধ্যে টেবিলের তুলনায় বেশি তথ্য রিপ্রেজেন্ট করতে পারে। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল তুমি যেটাই ব্যাবহারকর ঠিকমত লেবেল করে দিতে হবে। নয়তো তোমার পুরো প্রজেক্ট বিফলে যেতে পারে!

মনে রাখবে এই ফলাফল বা সিদ্ধান্তের ভিত্তিতেই তোমার প্রকল্পের প্রাসঙ্গিকতা ও উপযোগিতা যাচাই করা হবে। তাইখুব স্পষ্ট ভাষায় ও গুছিয়ে এই প্যারাটি লিখতে হবে।

6 Conclusion(উপসংহার)

উপসংহার সেকশনে তোমার প্রশ্নগুলো এবং যে রেজাল্ট পেয়েছ সংক্ষেপে সেগুলো আরেকবার রিভিউ করবে। প্রাপ্ত রেজাল্ট(গবেষণা) কেন ইন্টারেস্টিং এবং গুরুত্বপূর্ণ সেটা লিখতে ভুলবে না। অর্থাৎ তোমার এই গবেষণা থেকেপ্রাপ্ত ফলাফল কীভাবে ভবিষ্যতে কাজে আসতে পারে তা তুমি এইপ্যারায় উল্লেখ করবে।

7 References(তথ্যসূত্র)

যেসব সূত্র থেকে তুমি ডেটা বা তথ্য সংগ্রহ করেছ সেগুলি এই সেকশনে উল্লেখ করতে হবে। যদি অনেক বেশি সূত্র থেকে তুমি ডাটা সংগ্রহ করে থাকো তবে সেগুলি দুটি কলামে লিখতে পারো।

8 Acknowledgement(কৃতজ্ঞতা)

তোমার গবেষণা প্রকল্পে যদি কারও থেকে কোন সাহায্য নাও (প্রতিষ্ঠানও হতে পারে) তবে তার বা তাদের নাম উল্লেখ করতে হবে এই সেকশনে। প্রকল্পটি যদি দলগতভাবে কর তবে অবশ্যই সবার নাম উল্লেখ করবে। মনে রাখবে এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। এই সেকশনটি যথাসম্ভব সংক্ষিপ্ত করবে (৪০ শব্দের মধ্যে শেষ করা ভালো)।

কিছু টিপস

পোস্টারের আদর্শ সাইজ

শিশু-কিশোর বিজ্ঞান কংগ্রেসে যারা সায়েন্টিফিক পোস্টার আনবে, তাদেরকে নিচের সাইজগুলির মধ্য থেকে যেকোনো একটা সাইজ বেছে নিতে হবে। একটু কমবেশি হলে কোন সমস্যা নেই।

পোস্টার শক্ত কাগজে যেমন করা যাবে, তেমনি চাইলে পিভিসিতে প্রিন্ট করেও আনা যাবে।

লেখাটি তৈরি করেছেন বাংলাদেশ বিজ্ঞান জনপ্রিয়করণ সমিতির অ্যাকাডেমিক সদস্য ফারিনা আজিজ এবং আব্দুর রাজ্জাক।