শিশু-কিশোর বিজ্ঞান কংগ্রেস ২০১৬


বড় বড় বিজ্ঞানীরা যখন নতুন কিছু আবিষ্কার করেন, তখন সেটা কোন একটা বৈজ্ঞানিক কনফারেন্সে এসে উপস্থাপন করেন। কিন্তু বিজ্ঞানীরা যে কেবল বয়সে বড় হবে, সেটা কে বলেছে! যারা স্কুল-কলেজে পড়ে, নতুন কিছু আবিষ্কারের নেশায় সারাদিন ব্যস্ত থাকে, নতুন কিছু একটা দেখলে সেটার দিকে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে থেকে ভাবে, “আচ্ছা এটা কীভাবে কাজ করে? যেভাবেই হোক বের করতে হবে!”, এরপরে স্ক্রু ড্রাইভার আর প্লায়ার্স নিয়ে ফ্লোরে বসে পুরো জিনিসটা খুলে টুকরো টুকরো করে ফেলে, তারা যদি বড় বিজ্ঞানীদের মত নতুন কিছু আবিষ্কার করে, তখন তারা কি কনফারেন্সে যেতে পারবে না! তারা কি বাঘা বাঘা সব বিজ্ঞানীর মতো পেপার লিখে তাদের আবিষ্কার প্রকাশ করতে পারবে না? অবশ্যই পারবে। যারা স্কুল-কলেজে পড়ে, তারা নতুন কিছু তৈরি করলে, কিংবা আবিষ্কার করলে সেটা নিয়ে চলে আসতে পারে শিশু-কিশোর বিজ্ঞান কংগ্রেসে। গত তিন বছর ধরে দেশের শিশু-কিশোরদের জন্যে নিয়মিতভাবে অনুষ্ঠিত হচ্ছে ক্ষুদে বিজ্ঞানীদের মিলনমেলা শিশু-কিশোর বিজ্ঞান কংগ্রেস।

এবছরও গত ২৩ এবং ২৪ সেপ্টেম্বর ঢাকার ইউনিভার্সিটি অফ এশিয়া প্যাসিফিকে অনুষ্ঠিত হয়েছে বিএফএফ-এসপিএসবি শিশু-কিশোর বিজ্ঞান কংগ্রেস ২০১৬। দেশের স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিজ্ঞানশিক্ষা জনপ্রিয় করে তোলা, শিক্ষার্থীদের সত্যিকার বিজ্ঞানীদের মতো করে চিন্তা এবং গবেষণা করতে শেখানো এবং গুগল সায়েন্স ফেয়ার ও ইন্টেল ইন্টারন্যাশনাল সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ফেয়ারে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণের লক্ষ্য নিয়ে এবছর চতুর্থবারের মতো এই কংগ্রেস আয়োজিত হয়।

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সার্বিক সহযোগিতায় বাংলাদেশ বিজ্ঞান জনপ্রিয়করণ সমিতি (এসপিএসবি) ও বাংলাদেশ ফ্রিডম ফাউন্ডেশনের (বিএফএফ) শিশু-কিশোর বিজ্ঞান কংগ্রেস আয়োজন করে।

শিশু-কিশোর বিজ্ঞান কংগ্রেস ২০১৬ এর বিজয়ীরা

এ বছর শিশু-কিশোর বিজ্ঞান কংগ্রেসে সারাদেশের হাইস্কুল পর্যায়ের প্রায় ৫০০ জন ছাত্রছাত্রী অংশগ্রহণ করেছে। শিক্ষার্থীরা কংগ্রেসে ৩টি ক্যাটেগরিতে অংশ নিয়েছে— প্রাইমারি (৩য়-৫ম শ্রেণি), জুনিয়র (৬ষ্ঠ-৯ম শ্রেণি) এবং সিনিয়র (১০ম-দ্বাদশ শ্রেণি)। ৫৮টি বৈজ্ঞানিক পেপার, ৪৩ টি বৈজ্ঞানিক পোস্টার এবং ৯৫ টি বিজ্ঞান প্রজেক্ট শিক্ষার্থীরা কংগ্রেসে উপস্থাপন করেছে। কংগ্রেসের দ্বিতীয় দিনে এদের মধ্য থেকে ২৭ টি কাজকে পুরষ্কার দেয়া হয়। এছাড়া কংগ্রেসের সেরা ৩টি গবেষণাকাজকে পেপার অফ দ্যা কংগ্রেস, পোস্টার অফ দ্যা কংগ্রেস এবং প্রজেক্ট অফ দ্যা কংগ্রেস হিসেবে পুরস্কৃত করা হয়।


চলো জানা যাক এই তিনটি সেরা গবেষণা নিয়ে।



পূর্ণর অনলাইন জাজ



পূর্ণ থাকে বরগুনার আমতলিতে। ও আমার কাছে অভিযোগ করেছিল, বরগুনার মতো জেলায় কখনো বিজ্ঞানের কোন বড় আয়োজন হয় না। ফলে এখানের ছেলেমেয়েরা জাতীয় পর্যায়ের আয়োজনেও সেরকমভাবে অংশ নিতে পারে না। এই অভিমান থেকেই কিনা জানি না, পূর্ণ এমন একটা প্রজেক্ট বানিয়েছে, যেটা ব্যবহার করে আমতলির মতো জায়গায় বসেও একটা ছেলে বা মেয়ে অনলাইনে প্রোগ্রামিং প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে পারবে পৃথিবীর আরেক মাথায় বসে থাকা ছেলে বা মেয়েটার সাথে। CoderzWar নামে পূর্ণ যে অনলাইন জাজিং সিস্টেমটি বানিয়েছে, সেটা সাধারণ ওয়েব সার্ভারেই চলবে, এবং পিসির অপারেটিং সিস্টেমের ওপর আলাদা কোন প্রভাব ফেলবে না। আর এই প্রজেক্ট দিয়েই শিশু-কিশোর বিজ্ঞান কংগ্রেস ২০১৬ তে আসা ৯৫ টি বিজ্ঞান প্রজেক্টের মধ্যে সেরা প্রজেক্ট - প্রজেক্ট অফ দ্যা কংগ্রেস পুরস্কার জিতে নিয়েছে সে।

প্রজেক্ট অফ দ্যা কংগ্রেস পুরস্কার বিজয়ী আতিয়াব জোবায়ের পূর্ণ

পূর্ণর পুরো নাম আতিয়াব জোবায়ের পূর্ণ। আমতলি একে গভমেন্ট হাই স্কুলের দশম শ্রেণিতে পড়ছে ও। পূর্ণকে ওর প্রজেক্ট নিয়ে জিজ্ঞেস করাতে ও জানায়, "কংগ্রেসে আমার প্রজেক্টের নাম ছিল লাইট আর্কিটেকচার অনলাইন জাজ। সাধারণত অনলাইনে প্রোগ্রামিং প্রতিযোগিতা পরিচালনা করার জন্য যে ধরনের সাইট ব্যবহার করা হয় তার নাম অনলাইন জাজ। আমি নিজেও এধরনের বেশ কয়েকটি প্রতিযোগিতায় অংশও নিয়েছি। এক রকম শখের বশেই এ ধরনের একটি সাইট তৈরি করার চিন্তা করি। তখন বিভিন্ন ধরনের ওপেন সোর্স প্রজেক্ট নিয়ে কাজ করার সময় আমি একটা ব্যাপার খেয়াল করলাম যে, এধরনের অনলাইন জাজগুলোর কার্যপদ্ধতি অনেক জটিল। এরা কোন একটা অপারেটিং সিস্টেমে একটা সফটওয়্যার হিসেবে ইন্সটল হয়ে অনেক জায়গা নেয়। সবচেয়ে জনপ্রিয় অনলাইন জাজ সফটওয়্যারটি কোন আলাদা সার্ভারে না চলে বরং নিজে সার্ভার পোর্ট তৈরি করে ইউজার অ্যাক্সেস এর ব্যবস্থা করে এবং পুরো একটি অপারেটিং সিস্টেম লেগে যায় এটি ব্যবহার করতে। তাই আমি এমন এক ধরনের অনলাইন জাজ তৈরি করার কথা চিন্তা করলাম, যেটা সাধারণ ওয়েব সার্ভারেই চলবে এবং পিসির উপর কোন আলাদা প্রভাব ফেলবে না। এজন্য আমি পিএইচপি এবং ব্যাশ ল্যাঙ্গুয়েজ ব্যবহার করে এমন এক ধরনের অনলাইন জাজ ডেভেলপ করেছি যা সাধারণ অনলাইন জাজ এর মতই কাজ করে কিন্তু কার্যপদ্ধতি অনেক সহজ। এর অন্যতম বিশেষ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এর আকার। এই সফটওয়্যারটি সাইজে সাধারণ অনলাইন জাজের প্রায় ৭ ভাগের ১ ভাগ। সম্পূর্ণ প্রসেসটি অনেক হালকা বলে এই প্রজেক্টের নাম দেয়া হয়েছে লাইট আর্কিটেকচার অনলাইন জাজ।"

পুরস্কার নিচ্ছে প্রজেক্ট অফ দ্যা কংগ্রেস পুরস্কার বিজয়ী আতিয়াব জোবায়ের পূর্ণ

পূর্ণর তৈরি করা এই অনলাইন জাজিং সিটেমটি ইন্টারনেতে www.coderzwar.com ডোমেইনে পাওয়া যাবে। প্রজেক্টটি নিয়ে কাজ করার সময়ে বেশ কিছু সমস্যাতেও পড়তে হয়েছে। ওয়েবসাইট তৈরি হওয়ার পর টেস্টিং এর জন্য সার্ভার, ডোমেইন কিনতে টাকা ছিল না। এরপর নতুন প্ল্যাটফর্ম দেখে বেশি ইউজার ছিল না। ফলে ঠিকভাবে পরীক্ষা করা যাচ্ছিল না যে এতে কী ধরনের সমস্যা বিদ্যমান। বড় আকারের প্রতিযোগিতা আয়োজনের জন্য প্রোগ্রামিংয়ের প্রবলেম তৈরি করতে অনেক ঝামেলা পোহাতে হয়েছে। পূর্ণ আরো জানায়, "এত কিছু বলতে গেলে একাই সামলাতে হয়েছে। পড়ালেখার পাশাপাশি এগুলো করতে গিয়ে পড়ালেখাও কিছুটা ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে।" পুরো কাজটিতে ওকে সাহায্য করেছে জাওয়াদ বিন হাফিজ এবং ইয়েলো সার্কেল নামে একটি প্রতিষ্ঠান।
এতোসব সমস্যার পরেও কংগ্রেসে যখন বিজয়ী হয়েছে, পূর্ণর চোখেমুখে তখন হাসি লেগেই আছে। ওকে জিজ্ঞেস করলাম, পুরস্কার তো পেয়েছ, ভবিষ্যতের পরিকল্পনা কী? "এখন পর্যন্ত এটি শুধুমাত্র কন্টেস্ট হোস্টিং প্ল্যাটফর্ম। এটিকে পূর্ণাঙ্গ প্রোগ্রামিং প্ল্যাটফর্ম হিসেবে গড়ে তোলার ইচ্ছা আছে।" পূর্ণ জানায়। ওর চোখে তখনো হাসি লেগেই আছে।



এমপেমবা ইফেক্টের রহস্যের পেছনে আকিব



শিশু-কিশোর বিজ্ঞান কংগ্রেসে পেপার অফ দ্যা কংগ্রেস, অর্থাৎ কংগ্রেসের সেরা পেপারের পুরস্কার পেয়েছে নটরডেম কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী ইশতিয়াক আকিব।

আকিব গবেষণা করেছে গরম পানি কেন ঠাণ্ডা পানির চেয়ে দ্রুত বরফ হয়, সেটা নিয়ে। অর্থাৎ একই পরিবেশে রেখে দিলে গরম পানি ঠাণ্ডা পানির আগে বরফ হবে। অ্যারিস্টটল, ফ্রান্সিস বেকন, রেনে দেকার্তের লেখাতেও এই বিষয়টার উল্লেখ পাওয়া যায়। তবে ১৯৬৯ সালে এ নিয়ে প্রথম পেপার প্রকাশ করেন করেন তানজানিয়ার ইরাস্টো এমপেমবা, এবং তার নামে এর নাম হয় Mpemba Effect। এর পরে আরও অনেকগুলো গবেষণাপত্র বের হয়, যেগুলো পানির বিভিন্ন নমুনা পরীক্ষা করে এবং তাত্ত্বিক মডেল দিয়ে বিষয়টি ব্যাখ্যার চেষ্টা করে। আকিব তার পেপারের জন্যে যে গবেষণা করেছে, সেখানে পানির জন্যে এমপেমবা ইফেক্ট পরীক্ষা করা ছাড়াও আরো বেশ কিছু তরলের জন্যেও সেটা পরীক্ষা করেছে।

এই গবেষণাটিতে পানির পাশপাশি মোম,গ্লিসারল, ইথানয়িক এসিড এবং নারকেল তেলের জন্য পরীক্ষা করা হয়। এদের দুটি করে নমুনা নেয়া হয় যার একটি গরম, আরেকটি ঠাণ্ডা। তারপর এদেরকে ঠাণ্ডা করা হয় এবং এক মিনিট পরপর তাপমাত্রার মান নেয়া হয়। দেখা যায় মোম এমপেমবা ইফেক্ট দেখায় না এবং তাপমাত্রা বনাম সময়ের গ্রাফের মধ্যে তেমন কোন পার্থক্য নেই। নারকেল তেলও এই ইফেক্ট দেখায় না, কিন্তু গ্রাফ দুটো ঠিক একরকম নয়,যার মানে প্রাথমিক তাপমাত্রার একটা ইফেক্ট আছে। ইথানয়িক এসিড আর গ্লিসারল এই ইফেক্ট দেখায়, তার কারণ তাদের গরম নমুনার ঠাণ্ডা হবার হার বেশি ছিল এবং কেলাসিত হবার সময় কম ছিল। মোমে হাইড্রোজেন বন্ধন নেই,নারকেল তেলে হাইড্রোজেন বন্ধন দুর্বল এবং পানি, ইথানয়িক এসিড এবং গ্লিসারলে এ বন্ধন শক্তিশালী। এটা প্রমান করে হাইড্রোজেন বন্ধনের উপস্থিতি এমপেমবা ইফেক্টের জন্যে দায়ী।

মোমের জন্য পরীক্ষার ফলাফল দেখায় যে, হাইড্রোজেন বন্ধন বাদ দিলে পানি এই ইফেক্ট দেখাবে না। তবে সাধারণ পানিতে ভারী পানি, লবণ, গ্যাস, অদ্রবীভূত পদার্থ ইত্যাদি থাকে। আবার গরম পানির বাষ্পীভবন অনেক বেশি, তাই এই জিনিসগুলোর প্রভাব থাকতে পারে। ভারী পানি,বরফের গলণাংক বাড়ায় আর লবণ কমায়। তার মানে, ভারী পানি থাকলে সেটা অপেক্ষাকৃত দ্রুত বরফ হলে আর পানিতে লবরণ থাকলে বরফ হতে বেশি সময় লাগবে। তাই বাকি জিনিসগুলোর জন্যে পরীক্ষা করা হয়।

নারকেল তেল ফ্রিজের ভেতর ঠাণ্ডা করা হচ্ছে। চলছে আকিবের গবেষণা

এজন্যে পাঁচটি নমুনা নেয়া হয়। প্রথম দুটিতে সাধারণ ট্যাপের পানি,তৃতীয়টি কয়েকবার ফিল্টার করা যাতে অদ্রবীভূত পদার্থ না থাকে, তার পরেরটা থেকে বাতাস বের করা এবং শেষটা বায়ুরোধী (এয়ারটাইট) যেন বাষ্পীভবন না হয়। প্রথম একটা ছাড়া বাকিগুলো ৭৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত তাপ দিয়ে সিল করে থার্মোমিটার দিয়ে প্রথমটার সাথে ফ্রিজে ঢোকানো হয়। এরপর প্রতি পাঁচ মিনিট পর পর সবগুলো নমুনার তাপমাত্রা নোট করা হয়।

সবার আগে সম্পূর্ণ বরফ হয় সাধারণ গরম পানির নমুনাটি। তারপর বরফ হয় সাধারিণ ঠাণ্ডা পানি। এরপর বরফ হয় ফিল্টার করা নমুনা,এরপর বাতাস বের করে নেয়া নমুনা। সবার শেষে বরফ হয় যে নমুনাটির বাষ্পীভবন হয়নি, সেটি। গরম পানিতে বাষ্পীভবন বেশি, আবার পরিচলন প্রক্রিয়ার জন্যে অদ্রবণীয় পদার্থ আরও সুষমভাবে ছড়িয়ে পড়ে, যার ফলে অদ্রবণীয় পদার্থের প্রভাব বাড়ে। কিন্তু গরম পানিতে গ্যাস কম থাকে। তার মানে এমপেমবা ইফেক্টে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করে বাষ্পীভবন, তারপর অদ্রবণীয় পদার্থ। আর গ্যাস উলটো ভূমিকা পালন করে।

পেপার অফ দ্যা কংগ্রেস পুরস্কার বিজয়ী ইশতিয়াক হোসেন আকিব

এই পরীক্ষাগুলো পেপারের শিরোনামের “কেন” এর উত্তর দেয়। উত্তর হল, হাইড্রোজেন বন্ধন,বাষ্পীভবন এবং অদ্রবণীয় পদার্থ। সাথে গ্যাস বাধা প্রদান করে। এই পরীক্ষা থেকে বুঝা যায় যে, আমরা যদি পানি আছে এমন কোন নমুনা সবচেয়ে দ্রুত বরফ করে চাই তবে আগে সেটাকে গরম করতে হবে এবং নিশ্চিত করতে হবে যেন তাতে সর্বোচ্চ ভারী পানি,দ্রবীভূত গ্যাস এবং অদ্রবণীয় পদার্থ থাকে। বাষ্পীভবন যেহেতু পানির পরিমাণ কমিয়ে দিচ্ছে তাই এটা বাদ দিয়ে বলা হল। এই তথ্য খাবারের কারখানা যেখানে Blast freezing করা দরকার পড়ে সেখানে ব্যবহার করা যাবে।

আকিব এই গবেষণা কাজটি শুরু করে ২০১৩ সালে। এতদিন ধরে ও এটার পেছনেই লেগে ছিল। ২০১২ সালে রয়্যাল সোসাইটি অফ কেমিস্ট্রি এমপেমবা ইফেক্ট নিয়ে ১৮ বছরের কম বয়সীদের কাছ থেকে পেপার আহবান করে। পেপার জমা দেয়ার ডেডলাইন পার হয়ে যাবার বহুদিন পরে আকিব একটা ম্যাগাজিন থেকে এই বিষয়টা নিয়ে প্রথম জানতে পারে। তখন সে বিষয়টা নিয়ে কাজ শুরু করে। এরপর ২০১৪ সাল থেকে শিশু-কিশোর বিজ্ঞান কংগ্রেসের জন্যে সে সিরিয়াস গবেষণা শুরু করে। এই গবেষণার কাজে যে ল্যাবরেটরি সুবিধা দরকার হয়েছে, সেটা নিয়ে আকিব আমাকে জানায়, “গবেষণার জন্য সরাসরি ল্যাবে কাজ করার দরকার ছিল না,তবে ল্যাবের কেমিক্যাল এবং কিছু টেস্টটিউব,কনিক্যাল ফ্লাস্ক ,মেজারিং সিলিন্ডার দরকার ছিল। নটর ডেম কলেজের কেমিস্ট্রি ল্যাব তাদের কেমিক্যাল ও কনিক্যাল ফ্লাস্ক যথাসাধ্য ব্যবহার করতে দিয়েছে। পটুয়াখালী সরকারি জুবিলী উচ্চ বিদ্যালয়ও আমাকে ল্যাবের যন্ত্রপাতি ব্যবহার করতে দিয়েছে।”

গবেষণাটি করতে গিয়ে আকিব বেশ কিছু সমস্যাতেও পড়েছে। ডিপ্রেসারাইজার না থাকা, ম্যানুয়ালি তাপমাত্রা নোট করার কারণে ফ্রিজের ভেতরের তাপমাত্রা পরিবর্তন হয়ে যাওয়া, চাহিদামত বৈশিষ্ট্যের তরল না পাওয়া, যে তরলগুলো পাওয়া গেছে, সেগুলোও বিশুদ্ধ না হওয়া -এরকম বেশ কিছু সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়েছে। এরপরেও পুরো কাজটা ঠিকঠাকভাবে শেষ করা গেছে, এবং সেটার জন্যে আকিব বেশ কিছু মানুষের কাছে কৃতজ্ঞ। এদের মধ্যে আছেন নটরডেম কলেজের রসায়ন বিভাগের শিক্ষক বদরুজ্জামান মুন্না এবং দুলাল টুডু, পটুয়াখালী সরকারি জুবিলী উচ্চ বিদ্যালয় এর শিক্ষক পবিত্র চন্দ্র হালদার এবং সুপান্থ রক্ষিত ও আজিজুল হাকিম ফাহিম।

পুরস্কার নিচ্ছে পেপার অফ দ্যা কংগ্রেস পুরস্কার বিজয়ী ইশতিয়াক হোসেন আকিব

আকিব শিশু-কিশোর বিজ্ঞান কংগ্রেসের আয়োজকদের প্রতিও কৃতজ্ঞতা জানিয়েছে, “আমি ধন্যবাদ দিতে চাই বাংলাদেশ বিজ্ঞান জনপ্রিয়করণ সমিতিকে, যারা সায়েন্স কংগ্রেস আয়োজন না করলে আমি হয়ত কখনই সিরিয়াসভাবে রিসার্চ করতাম না,তাদের পরামর্শ অনেক কাজে লেগেছে। এছাড়া কংগ্রেসের বিচারকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা, আমার রিসার্চ নিয়ে তাদের মন্তব্য পরের কংগ্রেসের আগে আরও ভাল রিসার্চ করতে কাজে লাগবে।”
আকিব পুরো কাজটা আরো বেশি কিছু তরলের জন্যে করে দেখতে চায়। এই বৈজ্ঞানিক পেপারটা তার কোন ভালো জার্নালে প্রকাশ করার ইচ্ছে আছে বলেও আমাকে জানায়।



নিলয় এবং হিল্লোলের জৈব দ্রবণ



নিলয় এবং হিল্লোলের পোস্টারের বিষয় ছিল কলার খোসা থেকে তৈরি জৈব দ্রবণ দ্বারা শস্যের ফলন ও বৃদ্ধি পর্যবেক্ষণ। এই পুরো গবেষনাণায় তারা কলার খোসা থেকে শস্যের বৃদ্ধি বাড়ানোর জন্যে একটি বৃদ্ধিবর্ধক তরল তৈরি করেছে। এজন্য ওরা বীজের অঙ্কুরোদগম নিয়ে পরীক্ষা করে দেখেছে। পরীক্ষাগুলো করার সময় পানি কন্ট্রোল গ্রুপ আর জৈব দ্রবণ ভ্যারিয়েবল হিসেবে কাজ করেছে। পরীক্ষাগুলো থেকে প্রাপ্ত ডাটাগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, জৈব দ্রবণটি বীজের অঙ্কুরোদগমের হার বৃদ্ধি করার পাশপাশি সেটি দ্রুত করতেও সহায়তা করে। এর পাশাপাশি শস্যের উৎপাদন ও গড় উচ্চতা বৃদ্ধি করে। বর্তমানে সারা বিশ্বে একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হচ্ছে খাদ্য সংকট যা ভবিষ্যতে আরো বড় আকার ধারণ করবে। নিলয় এবং হিল্লোলের মতে, এই সমস্যা মোকাবিলায় আমাদের কতগুলো কার্যকর উপায় খুঁজতে হবে। এর মধ্যে একটি হচ্ছে এই কলার খোসা থেকে তৈরি জৈব দ্রবণের এর মতো বৃদ্ধিবর্ধকের ব্যবহার বাড়ানো।

পোস্টার অফ দ্যা কংগ্রেস পুরস্কার বিজয়ী হিল্লোল রায় ও সামিন ইয়াসার নিলয়ের পোস্টার

নিলয় আমাকে জানায়, তারা এক বছরের বেশি সময় ধরে এই গবেষণা কাজটি করছে। কাজটি করার সময় কিছু সমস্যার মুখোমুখিও তাদের হতে হয়েছে। কাজগুলো করার সময় তাদের ল্যাব ব্যবহার করার প্রয়োজন ছিল। কিন্তু ল্যাব ব্যবহার করার সুবিধা না থাকায় কতগুলো পরীক্ষা করতে সমস্যা হয়েছে। এছাড়া বীজগুলো প্রায়ই জীবাণু দ্বারা সংক্রমিত হচ্ছিল। এসব কিছুর পরেও পুরো কাজটি যে ঠিকঠাকভাবে শেষ করা গেছে, সেজন্যে ওরা দিনাজপুর ম্যাথ ক্লাবে তাদের সহপাঠী এবং বড় ভাইয়া, শিক্ষক এবং বাংলাদেশ বিজ্ঞান জনপ্রিয়করণ সমিতির অ্যাকাডেমিক টিমের সদস্যদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে।

পোস্টার অফ দ্যা কংগ্রেস পুরস্কার বিজয়ী হিল্লোল রায় ও সামিন ইয়াসার নিলয়

নিলয় এবং হিল্লোলকে জিজ্ঞেস করেছিলাম এই কাজটি নিয়ে তারা ভবিষ্যতে আর কী করতে চায়। "ভবিষ্যতে আমরা এই অর্গানিক জুসটিকে আরো কার্যকর করার চেষ্টা করবো। এর পাশপাশি এটি যাতে কৃষকদের কাছে যাতে সহজলভ্য করা যায়, সে চিন্তাও আমাদের মাথায় আছে।", নিলয় জানায়।

পুরস্কার নিচ্ছে পোস্টার অফ দ্যা কংগ্রেস পুরস্কার বিজয়ী হিল্লোল রায় ও সামিন ইয়াসার নিলয়





শিবলী বিন সারওয়ার: সহকারী অ্যাকাডেমিক কোঅর্ডিনেটর, বাংলাদেশ বিজ্ঞান জনপ্রিয়করণ সমিতি